পাকিস্তানে ব্যবসা পরিচালনার খরচ প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। এক গবেষণা অনুসারে, খরচের এ ব্যবধান উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে নিজস্ব স্টার্টআপ শুরুর বদলে উৎসাহীদের বেতনভিত্তিক চাকরির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
দেশটির বাণিজ্য ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন পাকিস্তান বিজনেস ফোরামের (পিবিএফ) গবেষণা অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পাকিস্তানে একটি ব্যবসা পরিচালনা করতে গড়ে ৩৪ শতাংশ বেশি খরচ পড়ে।
পিবিএফের প্রধান সংগঠক আহমেদ জাওয়াদ জানান, এ উচ্চ ব্যয়ের জন্য দায়ী কাঠামোগত বিভিন্ন কারণ। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের ওপর কর এখনো অনেক বেশি। প্রতি লিটারে প্রায় ৮০ রুপি (২৮ সেন্ট) পেট্রোলিয়াম ডেভেলপমেন্ট লেভি (পিডিএল) আরোপ করা হয়। ঋণের ওপর সুদহার প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, যা আশপাশের দেশে প্রচলিত ৬-৭ শতাংশ সুদহারের প্রায় দ্বিগুণ।’
তিনি আরো যোগ করেন, পাকিস্তানে বিদ্যুতের গড় খরচ ইউনিট প্রতি ৩৪ রুপি, যেখানে আঞ্চলিক গড় মাত্র ১৭ রুপি। পাকিস্তানি মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়নও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি আরো খারাপ করেছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ১ ডলারের বিনিময়ে পাওয়া যেত ১১০ রুপি ৭০ পয়সা, গত ডিসেম্বরে যা দাঁড়িয়েছে ২৮০ রুপিতে। ফলে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এছাড়া কোম্পানিগুলোর ওপর কার্যকর কর সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ, যা আঞ্চলিক অর্থনীতিগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
গবেষণা ও জনমত জরিপ সংস্থা গ্যালাপ পাকিস্তানের নির্বাহী পরিচালক বিলাল ঘানি জানান, পাকিস্তানের ব্যবসা খাতে প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির অবনতির জন্য নীতিগত সিদ্ধান্তই দায়ী। দেশটির বিভিন্ন নীতির কারণে উৎপাদন উপকরণের দাম আঞ্চলিক বাজারগুলোর তুলনায় বেশি।
তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য ও শিল্পনীতি অনুসারে, সস্তা বিদেশী উপকরণের আমদানি সীমিত করে দেশীয় উৎপাদনকারীদের সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে। বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ না দিয়ে ব্যবসা খাতকে তুলনামূলক বেশি দামের স্থানীয় বিকল্পের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য করা হচ্ছে।’
বিলাল ঘানি আরো বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ, অর্থপাচারসংক্রান্ত উদ্বেগ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে পাকিস্তানকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে দেখা হয়। ফলে এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বেশি লাইসেন্সিং, সার্টিফিকেশন ও ডিউ ডিলিজেন্স প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে রফতানিকারক ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এসব শর্ত ব্যবসা পরিচালনার স্থায়ী খরচ বাড়িয়ে দেয়।’
ব্যয়বহুল পরিবেশ পাকিস্তানের অর্থনীতি বিশেষ করে রফতানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২১ সাল থেকে রফতানি খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে দেশটি। উদাহরণ টেনে আহমেদ জাওয়াদ বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বস্ত্র খাতে শত শত মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারতের মধ্যে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি ভারতের জন্য অনুকূলে হওয়ায় পাকিস্তানের বস্ত্র খাতকে আরো অসুবিধায় ফেলতে পারে।’
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় রফতানি শিল্প বস্ত্র খাত, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট রফতানির প্রায় ৬০ শতাংশ জুড়ে ছিল। গত ডিসেম্বরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে চিঠি দিয়েছে পিবিএফ, যেখানে আঞ্চলিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক বিদ্যুৎ ট্যারিফ এবং প্রতিযোগিতামূলক করপোরেট করহারসহ অন্যান্য ‘বাস্তব পদক্ষেপ’ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।
গ্যালাপ পাকিস্তান গত মাসে দেশটির গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, বর্তমানে বেতনভুক্ত কর্মীরা মোট দেশটির কর্মশক্তির ৬০ দশমিক ১, যা ২০১০-১১ অর্থবছরে ছিল ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে আত্ম-কর্মসংস্থান কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৮ শতাংশে, ২০১০-১১ সালে যা ছিল ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ।